মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের কাঁচাবাজার থেকে যে সড়কটি পশ্চিমে প্রধান সড়কে গিয়ে মিশেছে, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেটা সিটি করপোরেশনের সুনজরে পড়েনি। এখন এ বৃষ্টির সময় কাদা-পানিতে একাকার সড়কটি। খানাখন্দে ভরা সড়কের মাঝখানে স্থানে স্থানে জমে রয়েছে পানি। নিত্যদিন দুর্ভোগ সয়েই চলাচল করে এলাকাবাসী।
ওই সড়কের পাশের একটি বাসার বাসিন্দা আবদুস সালাম দুঃখ করে বলেন, চৈত্র-বৈশাখে ধুলার যন্ত্রণা এবং আষাঢ়-শ্রাবণে কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাই আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে। এর চেয়ে এখন গ্রামের রাস্তাও অনেক ভালো, উন্নত।’
মেট্রো রেল, ফ্লাইওভার, ওয়াসা, ডেসাসহ বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজে সময়ে-অসময়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বাদেই রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও অলিগলির অসংখ্য রাস্তার অবস্থা বেহাল। দীর্ঘদিন মেরামত না করা এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়া নিম্নমানের কাজের কারণে বছর ঘুরতেই ভেঙেচুরে যাচ্ছে রাস্তা। উন্নয়নকাজের ধীরগতির কারণেও খানাখন্দে চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে। উন্নয়নকাজের পরে অনেক সড়কেই দেখা যায় সিমেন্টের তৈরি স্যুয়ারেজের ঢাকনাগুলো উঁচু। ঢাকনার ওপর দিয়ে রিকশা চলতেও কষ্ট।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সড়কের দুরবস্থা দেখা গেছে।
উত্তর সিটির মিরপুর-১৪ নম্বর ওয়ার্ডের সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা সালাউদ্দিন বলেন, ‘মাত্র আট মাস আগে নির্মাণ করা সড়ক এখনই খানাখন্দে ভরে গেছে। ঠিকাদারের কাছ থেকে মানসম্মত কাজ বুঝে না নেওয়ার কারণে সরকারের যেমন অপচয় হচ্ছে, আবার জনগণেরও ভোগান্তি হচ্ছে।’
মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের ১ নম্বর সড়কের মাঝখানে ভাঙা। গর্ত ভরাট করতে ফেলা হয়েছে খোয়া ও ইট। পথচারী বা কোনো যানবাহন চলার অবস্থা নেই সড়কটিতে। ওই সড়কে অবস্থিত একটি বাড়ির মালিক মোসলেম উদ্দিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু আমাদের সড়কই বেহাল না, মিরপুর-১১ নম্বরের একাধিক সড়কের একই দশা। অলিগলির রাস্তার দিকেও খেয়াল নেই সিটি করপোরেশনের।
উত্তর সিটি করপোরেশনের একাধিক ওয়ার্ডেই রয়েছে ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা সড়ক। একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায়ও দেখা গেছে।
উত্তর সিটির ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আফসার উদ্দিন খান বলেন, ‘এটা ঠিক, অনেক সময় নিম্নমানের কাজের কারণে সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আবার আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেও সড়ক মেরামত করাতে পারি না। উন্নয়নকাজের টেন্ডার হয় কেন্দ্রীয়ভাবে সিটি করপোরেশন থেকে। কে কাজ পায় আমরা তা-ও জানি না। ঠিকাদার চিনি না। তাঁদের কাছ থেকে জনগণ কিভাবে কাজ বুঝে নেবে? আমরাই তো পারি না।’ তিনি মনে করেন, এসব উন্নয়নকাজে কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ত করলে কাজ দ্রুত ও আরো বেশি মানসম্মত হবে। ‘কারণ আমরা জনগণের কাছে থাকি। তাদের ভোটে নির্বাচিত হই, তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়’, বলেন আফসার উদ্দিন।
দক্ষিণের চানখাঁরপুল থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে আসার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বড় বড় একাধিক গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরা।
চানখাঁরপুল এলাকার দোকানদার অশোক দাস বলেন, ‘বলতে গেলে এ এলাকাটি মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে আসা-যাওয়া ও পুরান ঢাকায় প্রবেশের পথ। তার পরও কয়েক বছর ধরে মাত্র কয়েক গজ সড়কের এই করুণ দশা দূর করতে পারছে না সিটি করপোরেশন।’
হাতিরপুল বাজারের সমানের সড়কে খানাখন্দ। যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে পুরান ঢাকার ললিত মোহন দাস লেন, ডুরী আঙ্গুর দ্বিতীয় লেন, আবদুল খালেক লেন, তারেক লেন, নতুন পল্টন লেন, পিলখানা সড়ক, নবাবগঞ্জ কাঁচাবাজার সড়কসহ একাধিক সড়ক। দীর্ঘদিন মেরামত হয় না এসব এলাকার সড়ক ও রাস্তাঘাট।
নবাবগঞ্জ কাঁচাবাজার সড়কের বেহাল অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাজারের ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকেরা শুধু বড় বড় কথা বলেন। কেউ তো এলাকায় এসে দেখেন না আমরা কী জাহান্নামের মধ্য দিয়ে চলাচল করি।’
সিটি করপোরেশনের সড়কগুলো নির্মাণের পরপরই আবার সাবেক অবস্থায় ফিরে যায়, খানাখন্দে পরিণত হয়। কোনো সড়ক বছরের পর বছর মেরামত হয় না। দূর হয় না জনগণের ভোগান্তিও।
এমন অবস্থার ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে জনগণ মানে জনগণের প্রতিনিধিকে সম্পৃক্ত করে উন্নয়নকাজ পরিচালনা করা। এলাকার জনপ্রতিনিধিকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। জনপ্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ হওয়ার পর সড়ক দ্রুত ভেঙে পড়লে জনগণ তার প্রতিনিধিকে ধরতে পারে, কিন্তু এখন তা হচ্ছে না। ঠিকাদারি কাজ দেওয়া হয় কেন্দ্রীয়ভাবে সিটি করপোরেশন থেকে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এলাকাবাসী জনপ্রতিনিধির কাছে গেলে তাঁরা সহজে বলে দেন, আমি তো ঠিকাদারকে চিনি না। তিনি তো সিটি করপোরেশন থেকে কাজ নিয়েছেন। এখানে আমার কিছু করার নেই।’
Leave a Reply