কভিড-১৯ প্রকোপে বর্তমানে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যক্রম থমকে আছে; বাংলাদেশের চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। দ্রুত আমাদের এ চিত্রের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কারণ, একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো এর ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি; কেননা, এর সঙ্গে মানুষের জীবিকার প্রশ্নটিও জড়িত।

এমতাবস্থায় সরকারকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। নতুন ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বোঝা বাড়ানো উচিত হবে না। বৈশ্বিক এ মহামারির মধ্যে এ ধরনের ট্যাক্স ও ভ্যাট সৎ করদাতাদের দেউলিয়া করে দিতে পারে। কভিড-১৯-এর কারণে বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাইরাসটির প্রকোপে আমরাও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমাদের ব্যবসা মূলত নির্মাণ খাতের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট। কভিডের প্রাদুর্ভাবের কারণে এই খাতে ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় এ বছর আমাদের বিক্রি ৫০ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যেও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত জুলাই মাস থেকে আমাদের ডিলাররা দোকান খোলা রাখছেন। আমাদের পেইন্টাররাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে গ্রাহক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পেইন্টাররা যাতে সুরক্ষিত উপায়ে রং সংক্রান্ত সেবা নিশ্চিত করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উচিত ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ (পিপিই), মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং গ্লাভস প্রদান করা। এতে করে তাদের আয়ের পথ সুগম হবে বলে আশা করা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন টিকে থাকা এবং শুধু নিজেদের টিকে থাকাই এখানে মূল ব্যাপার নয়, আমাদের টিকে থাকতে হবে সবাইকে একসঙ্গে মিলে। আমাদের পেইন্টিং খাতে পেইন্টাররা ব্যবসায়িক ও সামাজিক ইকোসিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রতিকূল সময়ে পেইন্টারদের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে সৃষ্ট দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার মোট এক লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকার বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে; যা দেশের জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ। তবে, এসব প্যাকেজে বড় উদ্যোক্তারা বেশি সুবিধা পাবেন। প্রণোদনার অর্থ পেতে তাদের কোনো সমস্যা হবে না। তবে, ছোট ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হবে। তাদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা উচিত। কেননা, তাদের টিকিয়ে রাখাই বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ। বিক্রি না থাকায় দোকান ভাড়া ও কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের আয়ের একটি অংশ জমা রাখার মতো সক্ষমতা থাকে না। তাদের কোনো রিটেইন আর্নিংস নেই। প্রতিদিনের বিক্রির ওপর তাদের জীবিকা নির্ভরশীল। তারা যেন আবার ব্যবসা চালু করতে পারেন, সে জন্য লোকসানের ভাগটি সংশ্নিষ্ট সবাইকে নিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের ব্যাংকের মাধ্যমে এককালীন সহযোগিতা করা যেতে পারে। তাদের ভ্যাট, আয়কর কিংবা ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে সহযোগিতা করা সম্ভব। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), এসএমই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি করা যায়, সেটি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। জীবন ও জীবিকার অগ্রাধিকার নিয়ে পৃথিবী এখন দ্বিধাবিভক্ত। এ দুইয়ের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে আমাদের একটি মধ্যম পথ বেছে নিতে হবে। শ্রমিক অথবা কর্মচারীদের চাকরি নিশ্চিত করতে হবে।
কভিড-পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের ভৌত অবকাঠামোগুলোকে প্রস্তুত ও বিনিয়োগের নীতিসংক্রান্ত বিষয়গুলো ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। সারাবিশ্ব ও আমাদের সামনে যে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেটি কারও একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ভয়াবহ দুঃসময় কাটিয়ে উঠতে হবে।
কভিড-১৯ আমাদের ব্যবসায়িক মডেল পুনর্মূল্যায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তাকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আমরা যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এ প্রতিকূল সময় সামলে নিতে পারি, তাহলে আগামী দিনগুলোয় আরও শক্তিশালীভাবে আবির্ভূত হতে পারব।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড।
Leave a Reply