সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নদীবন্দরে প্রতিদিন এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু বন্দরে নেই শ্রমিকের বিশ্রামাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে আশ্রয় নেয়ার মতো কোনো শেড নেই। শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীদের বসার কোনো জায়গা নেই। একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে বন্দর এলাকা চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে নানা সমস্যা জর্জরিত বাঘাবাড়ী নদীবন্দর গুরুত্ব হারাতে বসেছে।

বন্দরটিতে প্রতি বছরই শুষ্ক মৌসুমে থাকে নাব্যতা সংকট। যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য ডুবোচরে আটকে পড়ে জাহাজ। এ কারণে পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি বন্দরে পৌঁছতে না পারায় লাইটারেজে করে পণ্য পরিবহন করতে হয়। এতে লোকসান গুনতে হয় বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীকে। বন্দরটি প্রতিষ্ঠার সময় সারসহ অন্যান্য পণ্য খালাসের জন্য চারটি জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। জেটিগুলো পুরনো ও নড়বড়ে হয়ে পড়ায় পণ্য খালাসও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
যে কারণে নদীবন্দরটিতে বর্ষা মৌসুমে দেশের অন্যান্য নৌবন্দর থেকে নদীপথে পণ্য অতি সহজে আনা গেলেও পর্যাপ্ত জেটির অভাবে দিনের পর দিন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকতে হয় পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে।

বন্দরটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে ইজারাদারদের নির্মাণ করা অস্থায়ী বাঁশের চাটাই এবং তক্তা দিয়ে তৈরি পাটাতন দিয়ে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে হয়। ফলে পণ্য নষ্ট হয়। দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় শ্রমিকদের। উপায় না থাকায় জীবন-জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই প্রতিদিন কাজ করছেন বন্দরের শত শত শ্রমিক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীর তীরে ১৯৮৩ সালে ৪৭ একর জায়গার ওপর নির্মিত হয় এ বন্দর। দ্বিতীয় শ্রেণীর বাঘাবাড়ী নদীবন্দর ব্যবহার করে বছরে প্রায় তিন লাখ টন সার, কয়লাসহ অন্যান্য পণ্য খালস করা হয়। এর মধ্যে ইরি-বোরো মৌসুমে বিদেশ থেকে আমদানি করা হাজার হাজার টন ইউরিয়া সার উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার বাফার গুদামে পাঠানো হয়। এছাড়াও এখানে রয়েছে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানির তেলের ডিপো। এখান থেকে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বন্দরটির অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক। এখানে কোনো শেড নেই। বাফার গুদামগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক ছোট। যে কারণে হাজার হাজার টন সার খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে।

পণ্য পরিবহনসহ নানা সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বন্দরটি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। অথচ এ বন্দর ইজারা দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছর পার হলেও বন্দরটির অবকাঠামোসহ কোনো উন্নয়নমূলক কাজ এবং সংস্কার হয়নি। আধুনিক বন্দরের সুবিধা থেকে বঞ্চিত বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর। যে কারণে অনেকটা জীর্ণ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে বাঘাবাড়ী নদীবন্দর। প্রথম শ্রেণীতে উন্নীতসহ আধুনিক সুবিধা দিয়ে বন্দরটির উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাঘাবাড়ী বন্দর ঘাট (হান্ডলিং) ইজারাদার আব্দুস সালাম ব্যাপারী বলেন, এ বন্দরের মাধ্যমে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। অথচ উন্নয়নের কোনো খবর নেই। আধুনিক কোনো সুবিধা নেই। পুরনো জরাজীর্ণ অবকাঠামো দিয়ে চলছে এর কার্যক্রম। সুবিধা না থাকায় ব্যবসায়ীরা বন্দর ব্যবহারের টাকা ঠিকমতো দিতে চান না। ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং ঘাটসংশ্লিষ্টদের এখনে ন্যূনতম সুবিধা নেই। ইজারার টাকা ওঠানোই কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাঘাবাড়ী বন্দরের ব্যবসায়ী মামা-ভাগ্নে এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এনায়েত উল্লাহ জানান, ডুবোচরে পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়লে ছোট ট্রলার দিয়ে পণ্য খালাস করতে হয়। এতে আমাদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয়। আবার বর্ষা মৌসুমে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে সমস্যা হয়। দীর্ঘদিন এ অবস্থা থাকলেও এর উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বাঘাবাড়ী বন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল ও সার সরবরাহের প্রধান মাধ্যম এ নদী বন্দরটি। বর্ষা মৌসুমে নদীপথে পণ্য অতি সহজে আনা যায়। তবে খালাসে কিছুটা সমস্যা হয়। শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটে বিপাকে পড়তে হয়। বন্দরের নানা সমস্যার কথা জানিয়ে এবং উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে।
Leave a Reply