
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে রেলে ভ্রমণকারী প্রত্যেকের নাম, সিট নম্বর, বয়স সব কিছুই টিকেটে উল্লেখ থাকে, শুধু তাই নয় স্টেশনে এবং যেই বগিতে আপনার সিট সেই বগির বাইরেও নামের তালিকা ঝুলানো থাকে। টিকেট কালোবাজারিদের হাত থেকে মুক্তি পেতে ভারতে যেমন নাম ও বয়স টিকেটে উল্লেখ থাকে আমাদের দেশেও এমনটি করা যায় কি না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।
একই সঙ্গে যাত্রার আগে প্রত্যেক বগিতে ভ্রমণকারীদের নামের তালিকা তাদের দেশে যেভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং টিকেট চেকারদের হাতেও সেই একই তালিকা থাকে আর সে অনুযায়ী তারা টিকেট চেক করেন এই পদ্ধতিও আমাদের দেশে অবলম্বন করা যেতে পারে। অনলাইনে যারা টিকেট কাটবেন তাদের টিকেটেও নাম ও বয়স উল্লেখ থাকবে আর স্টেশন থেকে যারা টিকেট সংগ্রহ করবেন তাদেরও নাম ও বয়স উল্লেখ থাকবে। কেননা ট্রেনে দেশি-বিদেশি সবাই ভ্রমণ করবেন। এ ছাড়া বিদেশিরা পাসপোর্ট দেখিয়ে স্টেশন থেকে টিকেট সংগ্রহ করতে পারবে সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। তাই টিকেটে নাম ও বয়স উল্লেখ করা হলে আর যাত্রার পূর্বে যাত্রীদের তালিকা ট্রেনের বগিতে টাঙিয়ে দিলে টিকেট কালোবাজারির মাত্রা অনেকটা কমে যাবে। আর এতে করে সাধারণ জনগণের জন্য ট্রেন ভ্রমণ আরও সহজ হবে বলে আমরা মনে করি।
একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার না করলেই নয়, ভারতে ভ্রমণ ও চিকিৎসাসেবার জন্য কমবেশি যেতে হয়। সে দেশে রেলে ভ্রমণ সত্যিই যে আনন্দদায়ক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কয়েক মাস পূর্বেই রেলের টিকেট অগ্রিম করার ব্যবস্থা রয়েছে। টিকেট ছাড়া যাত্রীরা ভ্রমণ করছেন এ বিষয়টি কখনই আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। এ ছাড়া টিকেট বিক্রির ক্ষেত্রে কালোবাজারিদের কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে, কেননা প্রত্যেকটি টিকেটে পরিচয় উল্লেখ থাকে। একবার পাঞ্জাব থেকে কলকাতায় আসছিলাম, আমরা দশ পনেরোজন ছিলাম। আমাদের মধ্য থেকে একজন দিল্লি চলে গেলে তার টিকেটটি আমাদেরই আরেকজন বৃদ্ধ বয়সি যিনি টিকেট করতে পারেননি তার কাছে দিয়ে বলেন আমার টিকেট দিয়ে আপনি চলে যান।
আমরা ভেবেছিলাম টিকেট ও সিট যেহেতু আছে তাহলে তো আর সমস্যা হওয়ার কথা না। কিছুক্ষণ পর টিকেট চেকার এসে টিকেট চাইলেন। একেক করে সবার টিকেট চেক করা হয়ে গেলে যিনি আরেকজনের টিকেট দিয়ে যাত্রা করছিলেন তার টিকেট চেক করতেই বললেন আপনার পরিচয়পত্র দিন। যেহেতু বাংলাদেশি ছিলেন, তাই পাসপোর্ট বের করে দেখালেন, টিকেটে যার নাম এবং বয়স উল্লেখ আছে তার কিছুই মিল খুঁজে না পেয়ে তার কাছ থেকে টিকেটের দ্বিগুণ মূল্য জরিমানা স্বরূপ আদায় করলেন। এক্ষেত্রে এরা এমন যে, একজনের নামে টিকেট কেটে অন্যজন যাতে যেতে না পারে সে ক্ষেত্রে তারা কঠিন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, কারও আইডি কার্ডের সঙ্গে যদি টিকেট না মেলে তাহলে জরিমানা ছাড়া জেলও হতে পারে। আমাদের দেশে রেলের টিকেট পাওয়া যায় না আর টিকেট পাওয়া যায় কালোবাজারির কাছে এটা শুনলে ভারতীয়রা হাসাহাসি করে।
বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত, এত বড় দেশ, তারা যদি তাদের টিকেটকে কালোবাজারিদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারছি না। অবশ্য আমরাও পারব। টিকেটের বিষয়ে বর্তমানে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আশা করি এতে অনেকটাই সুফল পাওয়া যাবে।
তবে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের বর্তমান রেলপথমন্ত্রী রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন আর এক্ষেত্রে ইতোমধ্যে তিনি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছেন বলে আমার ধারণা। কেননা একটি কথা তিনি বরাবরই বলে থাকেন যে, ‘মানুষ যেন স্বস্তিতে, স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারে, সেটিই আমার মূল লক্ষ্য।’ আর এ লক্ষ্যে তিনি কাজও করে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া রেলসেবা বাড়াতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের শেষ নেই। কেননা দেশের প্রতিটি জেলায় রেলসেবা পৌঁছে দিতে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে নির্মিত হয়েছে ৩৮১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ, ৩৪৭টি রেল সেতু। ক্রয় করা হয়েছে ১৪০টি ইঞ্জিন, প্রায় ৪০০টি যাত্রীবাহী ক্যারেজ। চালু হয়েছে ১৩৫টি নতুন ট্রেন। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার নতুন কর্মী। সম্প্রতি ৩০০ কিলোমিটার গতির ট্রেন পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রেলের উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। আমরা আশা করব, ‘টিকেট যার ভ্রমণ তার’- রেলের এই নতুন নিয়ম পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা হলে রেল ভ্রমণ সবার জন্য হবে আরও আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
লেখক : গবেষক।
Leave a Reply