‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজে থার্ড ডেক অফিসার পদে কর্মরত বিউটি আক্তার। মেরিন একাডেমির প্রথম ব্যাচের নারী ক্যাডেট তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে ‘এমভি বাংলার অর্জন’ জাহাজে তাঁর হাতেখড়ি হয়। ভবিষ্যতে মেরিন অফিসার হিসেবে সমুদ্রগামী জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে অনেক দূর যাওয়ার প্রত্যাশা তাঁর।
বিউটি আক্তারের মতোই নারী ক্যাডেট পিয়াল সাহা কাজ করছেন বেলজিয়ামের পতাকাবাহী যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজে। প্রায় দুই বছর ধরে ওই জাহাজে কর্মরত পিয়াল সাহা এখন ফিফথ (পঞ্চম) মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। এই জাহাজটি বিদেশ থেকে বাংলাদেশের মাতারবাড়ীতে এলএনজি গ্যাস পরিবহন করে আনে। একই জাহাজে ফোর্থ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার পদে বাংলাদেশি একজন পুরুষ ক্যাডেটও কর্মরত।

বিউটি ও পিয়ালের মতো ৫৬ ব্যাচের ১২০ জন নারী ক্যাডেট একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার দুই মাসের মধ্যে চাকরি পেয়েছেন। দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি জাহাজে তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া আরও ১৯৯ জন নারী ক্যাডেট প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। এখনো দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো নারী ক্যাডেটের চাকরি হয়নি। মূলত বিশ্ববাজারের ভারসাম্যহীনতার কারণে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্যাডেটদের চাকরির নিশ্চয়তা ছিল না। ওই সময় কয়েকটি ব্যাচের (৪৮, ৪৯ ইত্যাদি) ক্যাডেটরা প্রাক-সমুদ্র প্রশিক্ষণের পর জাহাজে নিয়োগ লাভে দেরি হয়। তবে ২০১৭ সাল থেকে বইতে শুরু করেছে সুবাতাস। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন তাদের জাহাজবহরে নারী ক্যাডেটদের নিয়মিতভাবে নিয়োজিত করে আসছে। কিন্তু দেশের বেসরকারি শিপিং কম্পানিগুলো নীরব। দেশে সমুদ্রগামী জাহাজের কম্পানি রয়েছে ২১টি।

২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে নারী ক্যাডেট ভর্তির নির্দেশনা প্রদান করেন। সেই নির্দেশনা মেনে পরের বছর ২০১২ সালে ৪৮তম ব্যাচের সঙ্গে ভর্তি হন নারী ক্যাডেট। দুই বছর প্রাক-সমুদ্র প্রশিক্ষণ শেষে নারী ক্যাডেটদের ১৬ জনের প্রথম ব্যাচ বের হয় ২০১৪ সালে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারী ক্যাডেটদের একজন বলেন, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ আটটি। এর মধ্যে একটি ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য দুটির আয়ুষ্কালও প্রায় শেষ। এমতাবস্থায় বেসরকারি জাহাজ কম্পানিগুলো এগিয়ে এলে নারী ক্যাডেটদের চাকরির ক্ষেত্র আরো বড় হতো। কিন্তু কম্পানিগুলো চাকরি দিচ্ছে না। বেসরকারি জাহাজগুলোতে ন্যূনতম দুজন করে নারী ক্যাডেটকে চাকরি দেওয়ার সুযোগ আছে।
মেরিন একাডেমির ব্যবসায় উন্নয়ন কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার অনুরোধ জানানোর পরও বেসরকারি জাহাজে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের সমুদ্রকন্যাদের চাকরি হচ্ছে না, এটা দুঃখজনক। তবে সুখবর হচ্ছে, নারী ক্যাডেটরাও পুরুষ ক্যাডেটদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদেশি জাহাজে চাকরি করছেন। অদূর ভবিষ্যতে এই খাতে আরো বেশি দক্ষ জনবল তৈরি করে বৈদেশিক জাহাজে নিয়োগের সুবর্ণ সুযোগ আসছে। এতে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।

৪৮তম ব্যাচের প্রথম নারী ক্যাডেটদের একজন শারমিন হাসান শেলী বলেন, ‘আমার কাছে সমুদ্রজীবনই প্রিয়। কয়েক মাস আগে বিয়ে করার পর স্বামীর সংসারে ডাঙায় আছি। কিছুদিনের মধ্যে মার্কিন একটি জাহাজে যোগদান করব বলে ভাবছি।’
দেশের মার্চেন্ট মেরিন অফিসার/ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির বাজার বড় হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেরিন একাডেমির ৩৮তম ব্যাচের ক্যাডেট ক্যাপ্টেন নূর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘মেরিন ক্যাডেটদের চাকরির বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। করোনাকালে বিশ্বব্যাপী এই চাহিদা বেড়েছে। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশি মেরিন ক্যাডেটদের চাহিদা আরো বাড়বে।’ তিনি উদারহণ দিয়ে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও দেশের অন্যতম শিল্প গ্রুপের এলএনজি জাহাজে বিদেশি ক্যাপ্টেনরা শিপ-টু-শিপ গ্যাস ট্রান্সফারের কাজটি করতেন। এখন দেশীয় ক্যাপ্টেনরাই কাজটি করছেন।
Leave a Reply