এবারের ঈদ যাত্রার ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১২টি দুর্ঘটনায় ১০ জন, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে আটটি দুর্ঘটনায় ১০ জন এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৯ দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়। সড়কপথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে।

ঈদ যাত্রার ১৫ দিনে সড়ক-মহাসড়কে ২৭৭টি দুর্ঘটনায় ২৯৯ জন নিহত ও ৫৪৪ জন আহত হয়েছে। আর সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৩৪০ জন নিহত ও ৫৬৯ জন আহত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৮২ জন চালক ও ৯ জন পরিবহন শ্রমিক।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ঈদ যাত্রায় দুর্ঘটনাসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
গত ২২ জুন থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত ১৫ দিনকে ঈদ যাত্রা ধরা হয়েছে। তবে আগের বছরের ঈদুল আজহায় যাতায়াতের তুলনায় এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ১৫.১৬ শতাংশ, প্রাণহানি ৩৩.১১ শতাংশ ও আহত ৪২.২৭ শতাংশ কমেছে।

এবার ঈদের যাতায়াতের ১৫ দিনে রেলপথে ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছে। নৌপথে ১০টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ১৫ জন আহত ও ছয়জন নিখোঁজ হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারে দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল এবং দ্বিতীয় স্থানে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান। ৯১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৯৪ জন নিহত ও ৭৭ জন আহত হয়েছে। এটি মোট দুর্ঘটনার ৩২.৮৫ শতাংশ, মোট নিহতের ৩১.৪৩ শতাংশ ও মোট আহতের ১৪.১৫ শতাংশ। আর ৮৮টি ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনায় ৯৩ জন নিহত ও ১৯৩ জন আহত হয়েছে। এটি মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩১.৭৬ শতাংশ, নিহতের ৩১.১০ শতাংশ ও আহতের ৩৫.৪৪ শতাংশ প্রায়।
এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় চালক ও পরিবহন শ্রমিক ছাড়াও ৩৫ জন পথচারী, ৪৭ জন নারী, ২৫টি শিশু, ১৭ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য, চারজন শিক্ষক ও পাঁচজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নিহত হন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মনিটর করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার ৩৬.৪৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৯.২৪ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৯.৬০ শতাংশ সংযোগ সড়কে সংঘটিত হয়। এ ছাড়া সারা দেশে মোট দুর্ঘটনার ১.৮ শতাংশ ঢাকা মহানগরে সংঘটিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন হলেও সড়ক নিরাপত্তায় গবেষণা না থাকা, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রকৃত দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকা, তদন্তে দুর্বলতা, আইনের দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে সড়ক নিরাপত্তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

দুর্ঘটনা কমার পেছনে সমিতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষের কম যাতায়াত হয়েছে। এবার দুর্ঘটনা কম হলেও ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ঈদুল আজহায় যাতায়াতে ধারাবাহিকভাবে সড়কে মৃত্যু বেড়েছে। শুধু ২০১৯ সালে সড়কে মৃত্যু কম হয়েছে। গত সাত বছরে শুধু ঈদুল আজহার যাতায়াতে সড়কে এক হাজার ৬০৭টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ৮৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংঘটিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৬.৩৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৫৪.৫১ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়া, ১০.১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া, ০.৭২ শতাংশ ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের ঘটনা এবং ৬.৪৯ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
কোন মহাসড়কে কত মৃত্যু : ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পাঁচ দুর্ঘটনায় ছয়জন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তিন দুর্ঘটনায় চার, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে তিন দুর্ঘটনায় দুই, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে দুই দুর্ঘটনায় তিন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে আট দুর্ঘটনায় সাত, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সাত দুর্ঘটনায় ছয়, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে চার দুর্ঘটনায় ছয়, ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা মহাসড়কে দুই দুর্ঘটনায় তিন এবং কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে দুই দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার কারণ : দুর্ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ইজি বাইকের অবাধে চলাচল; অতিরিক্ত গতি, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা, উল্টোপথে যানবাহন চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন।
আট সুপারিশ : দুর্ঘটনা কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে আটটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল ও ইজি বাইকের মতো ছোট ছোট যানবাহন আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা; ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা; সড়ক পরিবহন আইন যথাযতভাবে বাস্তবায়ন করা; ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করা এবং ঈদের তিন দিন আগে থেকে জাতীয় মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা।
ছয় দিনে ১০৮ জনের মৃত্যু : এদিকে চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনে ১২৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ২৫৪ জন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। বিআরটিএর বিভাগীয় দপ্তরের মাধ্যমে দুর্ঘটনার এ তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।
Leave a Reply